চর্যাপদ
![]() |
| বাংলা সাহিত্যের প্রথম নিদর্শন: চর্যাপদ। |
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চর্যাপদ একটি অমুল্য রত্ন। এটি বাংলা ভাষার প্রথম কাব্য সংকলন এবং আদি নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। চর্যাপদ শুধু ভাষার দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি আমাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও সমাজের প্রাচীন চিত্রও তুলে ধরে। আসুন দেখি চর্যাপদ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ।
চর্যাপদের আবিষ্কার ও প্রকাশ
চর্যাপদ প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। এটি ১৯০৭ সালে নেপালের রাজগ্রন্থশালা থেকে উদ্ধার করা হয়। প্রথমবার এটি প্রকাশিত হয় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক, এবং চর্যাপদকে সম্পাদনা করেন শ্রী হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।
শাস্ত্রী চর্যাপদের আদি কবিকে মনে করেন লুইপা। তার প্রকাশিত গ্রন্থের নাম ‘হাজার বছরের পুরান বাঙ্গালা ভাষার বৌদ্ধগান ও দোহান’। এছাড়া ডঃ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ চর্যাপদ বিষয়ক একটি গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন, যার নাম Buddhist Mystic Songs।
চর্যাপদের বৈশিষ্ট্য
- চর্যাপদ মূলত সাধন সংগীত, যা সহজিয়া বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত।
- এটি বাংলা সাহিত্যের আদি যুগের নিদর্শন।
- চর্যাপদে মোট কবির সংখ্যা ২৪টি (মতান্তরে ২৩)। সবচেয়ে বেশি পদ রচনা করেছেন কাহ্নপা (১৩টি)।
- একমাত্র নারী কবি ছিলেন কুক্কুরীপা।
- চর্যাপদে ব্যবহৃত ছন্দ হলো মাত্রাবৃত্ত।
- এটি একপ্রকার গান এবং কিছু অংশে সান্ধ্য ভাষার ব্যবহার দেখা যায়।
- অপর নামগুলো হলো দোহাকোষ, চর্যাগীতি, চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, চর্যাগীতিকা, চর্যাসংগীত।
চর্যাপদের রচনা কাল ও ইতিহাস
চর্যাপদ রচনা শুরু হয় পাল রাজবংশের আমলে, আনুমানিক ৭ম থেকে ১২শ শতক। বয়স প্রায় ১০০০ বছর। প্রথম প্রাপ্ত পদ সংখ্যা ছিল সাড়ে ৪৬টি, এবং মোট গানসংখ্যা ৫১টি।
প্রাচীনতম কবি ছিলেন শবরপা, এবং আধুনিক কবি হিসেবে পরিচিত সরহ পা। চর্যাপদে এমনও কবি আছেন যিনি নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় দিয়েছেন, যেমন ভুসুকুপা।
লিপি ও ছাপাখানার ইতিহাস
বাংলা অক্ষর এবং সাহিত্য প্রকাশের ইতিহাসও চর্যাপদের সঙ্গে জড়িত।
- ভারতীয় মৌলিক লিপি হলো ব্রাহ্মী লিপি, যা থেকে বাংলা লিপি উদ্ভূত হয়েছে।
- খরোষ্ঠী লিপি ডানদিক থেকে লেখা হত।
- পাঠান যুগে বাংলা লিপির স্থায়ী রূপ তৈরি হয়।
- উপমহাদেশে প্রথম ছাপাখানা স্থাপিত হয় ১৪৯৮ সালে।
- বাংলা অক্ষরের প্রথম নকশা তৈরি করেন চার্লস উইলকিন্স, যিনি বাংলা মুদ্রাক্ষরের জনক হিসেবে পরিচিত।
- বাংলাদেশে প্রথম ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয় রংপুরে, এবং বাংলা মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হয় ১৮০০ সালে।
চর্যাপদের প্রভাব
চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রথম নিদর্শন হওয়ায় এটি ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। এটি বৌদ্ধধর্মের প্রভাব এবং সাধন-সংগীতের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার গভীর সম্পর্ককে তুলে ধরে।
চর্যাপদ শুধু সাহিত্য নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং ভাষার জার্নাল। এই অমূল্য সংকলন আজও বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ধ্বনি হিসেবে অমর।

চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে আমাদের ভাষার শেকড়কে স্পষ্ট করে তোলে। চর্যাপদ আমাদের শেখায়—অল্প শব্দেও কত গভীর অর্থ প্রকাশ করা যায়। বাংলা ভাষার সৌন্দর্য আর ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা জাগাতে এই গ্রন্থের তুলনা নেই।
উত্তরমুছুন