বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ |
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। এই দীর্ঘ পথচলাকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়— প্রাচীন, মধ্য এবং আধুনিক যুগ। এর মধ্যে ১২০১ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ। দেব-দেবীর আরাধনা, লোকগাথা, প্রেম এবং মানবতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছিল এই যুগে।
আজকের ব্লগে আমরা এক নজরে দেখে নেব বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা যেকোনো সাহিত্যপ্রেমী বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পরীক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক।
১. অন্ধকার যুগ ও এর ভেতরের আলো
১২০১ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কী আক্রমণের পর থেকে পরবর্তী দেড়শো বছর অর্থাৎ ১০২১ থেকে ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ বলা হয়। তবে এই সময়েও কিছু সাহিত্য রচিত হয়েছিল।
- রামাই পণ্ডিত রচনা করেন ধর্মীয় তত্ত্বের গ্রন্থ 'শূন্যপুরাণ'।
- কবি জয়দেব সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেন বিখ্যাত 'গীতিগোবিন্দ'।
২. মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন: শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য
সর্বজন স্বীকৃত ও খাঁটি বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ হলো 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন'। এটি মধ্যযুগেরও প্রথম কাব্য।
- রচয়িতা ও কবি: মধ্যযুগের প্রথম কবি বড়ু চণ্ডীদাস এই কাব্যটি রচনা করেন।
- আবিষ্কার: ১৯০৯ সালে বসন্তরঞ্জন রায় windmills পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ার কাঁকিল্যা গ্রামের এক গোয়াল ঘরের চালার নিচ থেকে এটি উদ্ধার করেন।
- কাঠামো ও চরিত্র: কাব্যটি ১৩টি খণ্ডে বিভক্ত এবং এর অন্যতম প্রধান চরিত্র 'বড়াই', যিনি রাধাকৃষ্ণের প্রেমের দূতী হিসেবে কাজ করেছিলেন।
- সম্পাদনা: পরবর্তীতে এই গ্রন্থটি সম্পাদনা করেন মুহম্মদ আব্দুল হাই ও আনোয়ার পাশা।
৩. বৈষ্ণব পদাবলী ও ব্রজবুলি ভাষা
বৈষ্ণব পদাবলী মূলত পদ্যাকারে রচিত দেবস্তুতিমূলক রচনা। এর শৃঙ্গার রসকে বৈষ্ণব শাস্ত্রে 'মধুর রস' বলা হয়।
- বিদ্যাপতি: তিনি বৈষ্ণব পদাবলীর আদি বা প্রথম কবি হলেও নিজে একজন অবাঙালি কবি ছিলেন।
- ব্রজবুলি ভাষা: বাংলা এবং মৈথালী ভাষার সমন্বয়ে তৈরি এই কৃত্রিম কবি-ভাষাকে বলা হয় ব্রজবুলি। 'গীতিগোবিন্দ' এবং বৈষ্ণব পদাবলীর বহু পদ এই ভাষায় রচিত।
- শাক্ত পদাবলী: এই ধারার জন্য সর্বাধিক বিখ্যাত কবি হলেন রামপ্রসাদ সেন।
৪. শ্রীচৈতন্যদেব ও জীবনী সাহিত্য
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব ধর্মের প্রচারক শ্রীচৈতন্যদেবের প্রভাব ছিল অপরিসীম। তিনি নিজে কোনো গ্রন্থ রচনা না করলেও তাঁকে কেন্দ্র করেই বাংলা সাহিত্যে 'জীবনী সাহিত্য' ধারার জন্ম হয়।
- কড়চা: শ্রীচৈতন্যদেবের জীবনীগ্রন্থগুলোকে 'কড়চা' বলা হতো।
- বৃন্দাবন দাস: চৈতন্যদেবের জীবনভিত্তিক প্রথম কাহিনীকাব্য রচনা করে জীবনীকাব্য রচনার জন্য বিখ্যাত হন।
- কৃষ্ণদাস কবিরাজ: তিনি চৈতন্য জীবনী কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে পরিচিত।
৫. দেব-দেবীর আখ্যান: মঙ্গলকাব্য
মধ্যযুগের অন্যতম প্রধান নিদর্শন হলো 'মঙ্গলকাব্য'। স্বপ্নে দেবী কর্তৃক আদেশ লাভ করে কবিরা মূলত এই ধর্ম বিষয়ক আখ্যানগুলো রচনা করতেন। এই কাব্যে মনসা ও চণ্ডী—এই দুই দেবীর প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি।
| কাব্যের নাম | আদি কবি / শ্রেষ্ঠ কবি | গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও চরিত্র |
| মনসামঙ্গল | আদি কবি: কানা হরিদত্ত | বেহুলা-লক্ষিন্দরের কাহিনী এবং দেবতা-বিরোধী চরিত্র 'চাঁদ সওদাগর' এই কাব্যের অন্তর্গত। |
| চণ্ডীমঙ্গল | শ্রেষ্ঠ কবি: মুকুন্দরাম চক্রবর্তী | মানব জীবনের নিখুঁত চিত্রায়ণের জন্য তিনি বিখ্যাত। |
| ধর্মমঙ্গল | ময়ূর ভট্ট, রূপরাম চক্রবর্তী, শ্যামপণ্ডিত প্রমুখ | ধর্মঠাকুরের মহিমা কীর্তন। |
| অন্নদামঙ্গল | ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর | মধ্যযুগের শেষ বড় কবি ভারতচন্দ্র এই কাব্য রচনা করেন। |
৬. লোকসাহিত্য ও গীতিকা
সাধারণ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছড়া, গান, ধাঁধা, প্রবাদ-প্রবচনকে বলা হয় লোকসাহিত্য। এর প্রাচীনতম নিদর্শন হলো 'ছড়া'। এছাড়া কৃষিকাজের উপযোগী ডাক ও খনার বচন (যার মূলভাব শুদ্ধ জীবন যাপন রীতি) এর অন্যতম অংশ।
- সংগ্রাহক: বাংলা লোকসাহিত্য ও গীতিকা সংগ্রহে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন দীনেশচন্দ্র সেন এবং চন্দ্রকুমার দে।
ময়মনসিংহ গীতিকা: দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত 'পূর্ববঙ্গ গীতিকা'র প্রথম খণ্ডটি 'ময়মনসিংহ গীতিকা' নামে প্রকাশিত হয়। এটি বিশ্বের প্রায় ২৩টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এর দুটি বিখ্যাত পালা হলো:
- 'মহুয়া' (রচয়িতা: দ্বিজ কানাই)
- 'দেওয়ানা মদিনা' (রচয়িতা: মনসুর বয়াতি)
ধাঁধা ও প্রবাদের উদাহরণ:
- ধাঁধা: "বন থেকে বেরুল টিয়ে সোনার টপর মাথায় দিয়ে" (উত্তর: আনারস)
- প্রবাদ: "যদি থাকে বন্ধুর মন গাঙ পাড়াতে কতক্ষণ?"
৭. অনুবাদ কাব্য, পুথি ও কবিগান (মধ্যযুগের শেষভাগ)
মধ্যযুগেই প্রথম বাংলা অনুবাদ কাব্যের সূচনা হয়। মূলত সংস্কৃত মহাকাব্যগুলো বাংলায় অনূদিত হতে শুরু করে।
- রামায়ণ: মূল রচয়িতা বাল্মীকি (সংস্কৃত)। বাংলায় প্রথম অনুবাদ করেন কৃত্তিবাস ওঝা। তবে নারীদের মধ্যে সর্বপ্রথম রামায়ণ অনুবাদ করেন কবি চন্দ্রাবতী।
- মহাভারত: মূল রচয়িতা শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস। মহাভারতের শ্রেষ্ঠ অনুবাদক হলেন কাশীরাম দাস। এছাড়া কবীন্দ্র পরমেশ্বর অনুদিত মহাভারতটি 'পরাগলী মহাভারত' নামে পরিচিত।
- কবিগান ও ট গান: ১৮ শতকের শেষার্ধে ও ১৯ শতকের প্রথমার্ধে কবিওয়ালা ও শায়েরদের উদ্ভব ঘটে। কবিগানের প্রথম কবি ছিলেন গোঁজলা গুই। অন্য একজন বিখ্যাত কবিয়াল ছিলেন এন্টনি ফিরিঙ্গি। আধুনিক বাংলা গীতি কবিতার উৎস ধরা হয় এই 'ট গান'-কে। পাঁচালিকার হিসেবে এ সময় সর্বাধিক খ্যাতি ছিল দাশরথী রায়ের।
- পুঁথি সাহিত্য: মিশ্র ভাষায় রচিত পুঁথি সাহিত্যের প্রাচীনতম লেখক হলেন ফকির গরীবুল্লাহ।
শেষ কথা
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ কেবল দেব-দেবীর আরাধনার যুগ ছিল না, এটি ছিল বাংলা ভাষার ভিত গড়ে ওঠার সময়। এই যুগের সৃষ্টিগুলো আমাদের সংস্কৃতির শিকড়কে সমৃদ্ধ করেছে। মধ্যযুগের এই বৈচিত্র্যময় সাহিত্যভাণ্ডার আজও আমাদের আপ্লুত করে।