১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলন।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস

আজকের আলোচনা, ১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলন।

১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলন।
অসহযোগ আন্দোলন



১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলন।


বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মার্চ মাস বিশেষ তাৎপর্যময়। এ মাসে ঘটে অসহযোগ আন্দোলন, যা বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল মানতে অস্বীকৃতি, এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের টালবাহানা বাঙালিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলন শুধু পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধই ছিল না; বরং এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ।



পটভূমি

১৯৭০ সালের নির্বাচন

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে এবং জাতীয় সংসদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি অর্জন করে। জাতীয় পরিষদের মোট ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১৬৭ আসনই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছিল। অর্থাৎ, শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন।

পশ্চিম পাকিস্তানের অস্বীকৃতি

পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এই ফলাফল মেনে নিতে রাজি হয়নি। তারা মনে করেছিল, আওয়ামী লীগের ছয় দফা বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়বে। এজন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো নানা অজুহাতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান বিলম্বিত করতে থাকেন।

১ মার্চ ১৯৭১: সংকটের সূচনা

১৯৭১ সালের ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এই ঘোষণায় পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে তীব্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। জনসাধারণ মনে করলো যে পশ্চিম পাকিস্তান তাদের গণরায় অস্বীকার করেছে। এ থেকেই অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা।



অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা ও ধাপসমূহ

২ মার্চ: প্রতিবাদ ও পতাকা উত্তোলন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ২ মার্চে প্রথমবারের মতো “স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা” উত্তোলন করে। সেদিন সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয় এবং জনগণ বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিতে শুরু করে।

৩ মার্চ: ঐতিহাসিক ঘোষণা

৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্রনেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে স্বাধীনতার ম্যান্ডেট ঘোষণা করা হয়। একইদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ধানমণ্ডির বাসভবনে অসহযোগ আন্দোলনের নির্দেশনা দেন।

৭ মার্চ: বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা না করলেও জনগণকে প্রস্তুত থাকতে বলেন এবং অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তাঁর ভাষণের মূল বক্তব্য ছিলঃ

  • ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো।
  • এবার সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।
তার এই ভাষণই অসহযোগ আন্দোলনকে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপান্তরিত করে।

১–২৫ মার্চ: অসহযোগ আন্দোলনের ধারাবাহিকতা

বঙ্গবন্ধুর ডাকে সারাদেশে পাকিস্তান সরকারের সকল প্রশাসনিক কার্যক্রম অচল হয়ে যায়।

  • কর পরিশোধ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
  • অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
  • রেডিও-টেলিভিশনে শুধু বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ প্রচারিত হতো।
  • কার্যত পূর্ব পাকিস্তান তখন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই চলতে থাকে।


অসহযোগ আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য

১. গণআন্দোলনের রূপ 
এই আন্দোলন শুধু আওয়ামী লীগের ছিল না, বরং ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষ সকলে এতে যোগ দেয়। 

২. পূর্ণাঙ্গ অবাধ্যতা 
পাকিস্তান সরকারের সব আদেশ ও কার্যক্রম বর্জন করা হয়। ফলে ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পাকিস্তানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে। 

৩. নেতৃত্বের ঐক্য 
শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হয়। তাঁর নির্দেশই তখন পূর্ব পাকিস্তানে কার্যকর আইন হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। 

৪. অর্থনৈতিক অচলাবস্থা 
করের অর্থ সংগ্রহ বন্ধ হয়ে যায়, ব্যাংক লেনদেন সীমিত হয়ে পড়ে, এমনকি বাণিজ্যিক কার্যক্রমও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

পাকিস্তান সরকারের প্রতিক্রিয়া

পশ্চিম পাকিস্তান সরকার আন্দোলনকে দমন করার জন্য কূটনৈতিক ও সামরিক প্রস্তুতি নিতে থাকে।

  • প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করেন।
  • ভুট্টো ঢাকায় আসেন কিন্তু কোনো সমাধান মেনে নিতে রাজি হননি।
  • গোপনে পাকিস্তানি সেনারা পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র ও সৈন্য মজুত করতে থাকে।


অসহযোগ আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ

২৫ মার্চ ১৯৭১ পর্যন্ত অসহযোগ আন্দোলন ক্রমে স্বাধীনতার আন্দোলনে পরিণত হয়। এই সময়ে:

  • বঙ্গবন্ধু কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান হয়ে ওঠেন।
  • পাকিস্তানি সেনারা “অপারেশন সার্চলাইট” নাম দিয়ে গণহত্যার প্রস্তুতি নেয়।
  • জনগণ মুক্তিযুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়।


অসহযোগ আন্দোলনের গুরুত্ব

১. স্বাধীনতার ভিত্তি
এ আন্দোলন স্পষ্ট করে দেয় যে পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান একসাথে থাকতে পারবে না।

২. জনতার ঐক্য
৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতিকে অভিন্ন লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ করে।

৩. আন্তর্জাতিক মনোযোগ
অসহযোগ আন্দোলনের সময় বিশ্বের গণমাধ্যম পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলি গুরুত্বের সাথে প্রচার করে। ফলে আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়।

৪. প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়া
অসহযোগ আন্দোলনের সময় পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশই আইন হিসেবে গণ্য হয়।



১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতির স্বাধীনতার মূলে থাকা আন্দোলন। এটি ছিল শান্তিপূর্ণ কিন্তু শক্তিশালী গণআন্দোলন, যা পাকিস্তানি শাসকদের ভীত করে তোলে। যদিও ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা বর্বর হামলা চালিয়ে আন্দোলন দমন করতে চেয়েছিল, তবুও সেই ব্যর্থ প্রচেষ্টা বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। বলা যায়, অসহযোগ আন্দোলনই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দ্বার উন্মুক্ত করেছিল এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিল।

7 মন্তব্যসমূহ

  1. আন্দোলন টি গুরুত্বপূর্ন ছিল

    উত্তরমুছুন
  2. অসহযোগ আন্দোলনই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দ্বার উন্মুক্ত করেছিল

    উত্তরমুছুন
নবীনতর পূর্বতন