ভূমিকা:
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, গদ্যকার ও অনুবাদক। তাঁর অবদান বাংলা ভাষা, শিক্ষা সংস্কার ও সমাজ সংস্কারে আজও স্মরণীয়।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জন্মগ্রহণ করেন ১৮২০ সালে মেদিনীপুর জেলায়।
তাঁর পারিবারিক নাম ছিল ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
শিক্ষাজীবন ও উপাধি
তিনি কলকাতার সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়ন করেন। তাঁর অসাধারণ মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ সংস্কৃত কলেজ তাকে “বিদ্যাসাগর” উপাধি প্রদান করে।
১৮৪৯ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই উপাধি লাভ করেন।
তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের শিক্ষক হিসেবেও কর্মরত ছিলেন।
বাংলা গদ্য ও ভাষা সংস্কারে অবদান
বাংলা গদ্যের জনক হিসেবে তিনি স্বীকৃত।
বাংলা সাধু ভাষার জনক বলা হয় তাঁকেই।
বাংলা গদ্যে যথার্থ শিল্পী হিসেবেও তিনি পরিচিত।
বাংলা ভাষায় যতি চিহ্ন বা বিরাম চিহ্নের সুশৃঙ্খল ব্যবহার শুরু করেন তিনি।
বাংলা ভাষায় গ্রাম চিহ্নের ব্যবহার শুরু হয় ১৮৪৭ সাল থেকে।
বাংলা গদ্য সাহিত্যের প্রথম শোকগাঁথা গ্রন্থ হিসেবে পরিচিত “প্রভাবতী সম্ভাষণ” তাঁরই রচনা।
সমাজ সংস্কারে ভূমিকা
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন এক সাহসী সমাজসংস্কারক।
তিনি বিধবা বিবাহ প্রবর্তন বিষয়ে কলমযুদ্ধ শুরু করেন।
তাঁর প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়।
সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের রচিত ও অনূদিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ:
বেতাল পঞ্চবিংশতি – এটি বৈতাল পঞ্চবিংশতি গ্রন্থের অনুবাদ।
এই গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে নতুন যুগের সূচনা হয়।ভ্রান্তিবিলাস – এটি The Comedy of Errors নাটকের গদ্য অনুবাদ।
শকুন্তলা – তাঁর অনূদিত বিখ্যাত গ্রন্থ।
বর্ণপরিচয় – ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত এই বইটি ক্লাসিক মর্যাদা লাভ করে এবং বাংলা শিক্ষার ইতিহাসে এক মাইলফলক।
প্রভাতী সম্ভাষণ – বাংলা গদ্যের প্রথম শোকগাঁথা গ্রন্থ।
আত্মচরিত – তাঁর আত্মজীবনী।
অতি অল্প হইল – তাঁর রম্য রচনা।
এছাড়া তিনি “রামায়ণের অযোধ্যা কাণ্ড” অনুবাদ করেন, যা “ঋজু পাঠ (দ্বিতীয় ভাগ)” নামে পরিচিত।
সাংবাদিকতা
তিনি “সংবাদ প্রভাকর” পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা ১৮৩১ সালে প্রকাশিত হয়।
উপসংহার
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কেবল একজন সাহিত্যিক নন, তিনি ছিলেন এক যুগান্তকারী সমাজসংস্কারক। বাংলা গদ্য ভাষার উন্নয়ন, শিক্ষা সংস্কার, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।
বাংলা সাহিত্য ও সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে তাঁর নাম চির অম্লান থাকবে। ✨
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-এর গ্রন্থসমূহ (ধরনভিত্তিক তালিকা)
📖 ১. গদ্য সাহিত্য
* প্রভাবতী সম্ভাষণ
* অতি অল্প হইল
* আত্মচরিত
---
📚 ২. অনুবাদ ও রূপান্তর গ্রন্থ
* বেতাল পঞ্চবিংশতি
* শকুন্তলা
* ভ্রান্তিবিলাস
* সীতার বনবাস
* ঋজুপাঠ
---
📘 ৩. শিক্ষামূলক গ্রন্থ
* বর্ণপরিচয় (১ম ও ২য় ভাগ)
* বোধোদয়
* কথামালা
* চারিতাবলী
* জীবনচরিত
* সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা
* ব্যাকরণ কৌমুদী
---
🖋 ৪. সমাজসংস্কারমূলক প্রবন্ধ
* বিধবা বিবাহ
* বহুবিবাহ